Back

ⓘ নওগাঁ জিলা স্কুল




নওগাঁ জিলা স্কুল
                                     

ⓘ নওগাঁ জিলা স্কুল

নওগাঁ জিলা স্কুল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী সরকারি বিদ্যালয় যা নওগাঁ জেলায় অবস্থিত। কেবল ছেলেদের জন্য প্রতিষ্ঠিত এ স্কুলের অবস্থান নওগাঁ শহরের কেন্দ্রস্থল মুক্তির মোড়ে। বর্তমানে নওগাঁ জিলা স্কুলে তৃতীয় শ্রেনী থেকে দশম শ্রেনী পর্যন্ত পাঠদান করা হয়। স্কুলটি ১৯১৭ সালে স্থাপিত হয়। ১৯৪৫ সালে হাই স্কুলে রূপান্তরিত হয়। ১৯৮৫ সালে জাতীয়করণ করা হয়।

                                     

1. ইতিহাস

নওগাঁ জিলা স্কুল ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে নওগাঁতে প্রতিষ্ঠিত হয় করোনেশন মধ্য ইংরেজি স্কুল। ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট পঞ্চম জর্জের করোনেশন উপলক্ষে নওগাঁয় একটি বিরাট উৎসব হয়। এই উৎসব উপলক্ষে সংগৃহিত অর্থ দ্বারা প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত হয়। সূচনা লগ্নে এটি একটি পাঠশালা ছিল। এই পাঠশালায় পাঠদানে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করেছেন জনাব বদর উদ্দীন মিয়া বোয়ালিয়া ও জনাব লবণ পণ্ডিত। উল্লেখ্য যে স্বর্গীয় সুরেন্দ্রনাথ তলাপাত্র করোনেশন স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক। তাদের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে স্কুলটি ১৯৪২ সালে হাই ইংলিশ স্কুলে রূপান্তরিত হয়। এর অনেক পরে ১৯৬১ সালে নওগাঁর তদানীন্তন মহকুমা প্রশাসক জনাব আব্দু রব চৌধুরীর নেতৃত্বে বি.এম.সি কলেজের মাদ্রাসা শাখা প্রথমে প্যারালাল হাই স্কুল এবং পরবর্তীতে নওগাঁ হাই স্কুল নওগাঁ করোনশেন হাই স্কুল এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে ইউনাইটেড হাই স্কুল নাম ধারণ করে। ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে জাতীয় করণ করা হয় এবং নওগাঁ জিলা স্কুল-এ রূপান্তরিত করা হয়। ২৭ এপ্রিল ১৯৮৫ সালে তদকালীন প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরসাদ সাহেব নওগাঁ জেলায় আসেন। তার উদেশ্য ছিল নওগাঁ বালিকা বিদ্যালয় সরকারী করণ সহ অন্যান্য স্থাপনার কাজ করবেন। নওগাঁয় অনুষ্ঠিত জনসভা শেষে তদকালীন ইউনাইটেড স্কুলের শিক্ষকদের প্রস্তাবে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সাহেব ইউনাইটেড স্কুল দর্শন করেন। সেই সময় তিনি ইউনাইটেড স্কুলকে" নওগাঁ জিলা স্কুল” নামে ঘোষণা দেন।

                                     

2. অবকাঠামো

১.৭৬ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত। কাঠামোগতভাবে স্কুলটিতে ৩টি ভবন রয়েছে। স্কুলটি ত্রিতলা বিশিষ্ট। এর মধ্যে ১টি ছাত্রাবাস, ২টি ভবন রয়েছে। এই স্কুলের গ্রন্থাগারটি বেশ পুরোনো। এখানে অনেক দুঃপ্রাপ্য গ্রন্থ আছে। বিজ্ঞান ছাত্রদের জন্য রয়েছে বিজ্ঞানাগার। আইসিটি ল্যাব রয়েছে। এছাড়া সকল শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে খেলার মাঠ, নামায ঘর, অডিটরিয়াম, সাইকেল গ্যারেজ ও ২০টি শ্রেণি কক্ষ।

                                     

3. শিক্ষার্থীদের পোশাক

স্কুলের নির্দিষ্ট পোশাক হল সাদা শার্ট, খ্যাঁকি প্যান্ট ও সাদা জুতো। শার্ট ফুল হাতা বা হাফ হাতা দুটোই গ্রহণযোগ্য। এছাড়া শীতকালে নীল রঙের সোয়েটারও ইউনিফরমের অন্তর্ভুক্ত। শার্টের পকেটে স্কুলের মনোগ্রামযুক্ত ব্যাজ থাকা আবশ্যক। সাদা রঙের স্কুল জুতা আবশ্যক।

                                     

4. ভর্তি প্রক্রিয়া

এই সরকারি হাই স্কুলটিতে ৩য় থেকে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা প্রদান করা হয়। সাধারণত ৩য়, ৬ষ্ঠ এবং ৯ম শ্রেণীতে ছাত্র ভর্তি করা হয়। অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যোগ্য ছাত্রদের নির্বাচিত করা হয়।

                                     

5. শিক্ষা কার্যক্রম

বিদ্যালয়টিতে ৩য় শ্রেণী থেকে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ানো হয়। ৩য় শ্রেণীতে ভর্তি পরীক্ষা অংশগ্রহণ করে ছাত্ররা ভর্তি হয়। ৩য় শ্রেণী থেকে ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত মাত্র একটা শাখা বিদ্যমান, ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত দুইটি শাখা বিদ্যমান। প্রতিটি শ্রেণী/শাখাতে একজন ক্লাস শিক্ষক থাকে। সর্বপ্রথম ক্লাস ক্লাস শিক্ষক নেন। তিনি সেই ক্লাস নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি ছাত্রদের উপস্থিতি নিশ্চিত করেন,ছাত্রদের মাসিক বেতন গ্রহণ করেন,সেই শ্রেণীর ছাত্রদের অভিবাবক সাথে যোগাযোগ করেন, তিনি সেই শ্রেণীর সর্বশেষ ফলাফল দান করেন, সেই শ্রেণীর কোন ছাত্রর যেকোনো প্রকার সাহায্যর জন্য তিনি সর্বপ্রথম এগিয়ে আসেন। বিদ্যালয়টির পাশের হার ১০০%।

                                     

5.1. শিক্ষা কার্যক্রম প্রাত্যহিক সমাবেশ

প্রতিদিন সকালে বিদ্যালয়ের খেলার মাঠে প্রাত্যহিক সমাবেশ করা হয়। সমাবেশে ছাত্রদের মধ্যে একজন পবিত্র কুরআন থেকে তেলয়াত এবং তারপর গীতা পাঠ করে আরেকজন ছাত্র। তারপর সকল ছাত্র একসাথে শপথ বাক্য পাঠ করে,জাতীয় সঙ্গীত গায়। তারপর শারীরিক চর্চার শিক্ষক ছাত্রদের কিছু কসরত করান। প্রাত্যহিক সমাবেশে সকল ছাত্রদের থাকা বাধ্যতামূলক। সকল শিক্ষকও উপস্থিত থাকেন। প্রতিটা শ্রেণী এবং শাখার ছাত্ররা আলাদা আলাদা সুসৃঙ্খল সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। শিক্ষকগন সকল ছাত্রদের বাধ্যতামূলক ইউনিফরমের নিশ্চিত করেন। সবশেষে ছাত্ররা সারিবদ্ধভাবে মাঠ পরিত্যাগ করে এবং শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করে।

                                     

5.2. শিক্ষা কার্যক্রম বেতন

সরকারী স্কুল হওয়ায় এই বিদ্যালয়ে বেসরকারী স্কুলের তুলনায় খরচ অনেক কম। প্রতি মাসে বেতনের সাথে টিফিন ফি নেয়া হয়। মাসে ৩টা তারিখ থাকে বেতন দেওয়ার জন্য। শ্রেণী শিক্ষক বেতন আদায় করেন।

                                     

5.3. শিক্ষা কার্যক্রম আবাসন ব্যবস্থা

দূরের শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যালয়ের নিজস্ব আবাসন ব্যবস্থা আছে। এটি স্কুল প্রাঙ্গণের ভেতরেই অবস্থিত যা ‘নওগাঁ জিলা স্কুল হোস্টেল’ নামে পরিচিত। এতে আসন পেতে শ্রেণি-শিক্ষকের মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক বরাবর আবেদন করতে হয়।

                                     

6. শিক্ষা-সহায়ক কার্যক্রম

প্রতিবছর বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয় বিদ্যালয়ের নিজস্ব খেলার মাঠে । শ্রেণী হিসাবে ভাগ হয়ে ছাত্ররা দৌড় প্রতিযোগিতা, হাই জাম্প, লং জাম্প, গোলক নিক্ষেপ ইত্যাদিতে খেলায় অংশগ্রহণ করে। প্রতিযোগিতা শেষে ১ম,২য় ও ৩য় প্রতিযোগীকে পুরস্কৃত করা হয়। পুরস্কার বিতরনী অনুষ্ঠানে এলাকার গণ্যমান্য বাক্তিবর্গ এবং একজন বিশেষ ব্যক্তি প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকেন।

তাছাড়া বার্ষিক সংস্কৃতি প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয় হল রুমে। শ্রেণী হিসাবে ভাগ হয়ে ছাত্ররা রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুল সঙ্গীত, দেশের গান, আধুনিক গানের প্রতিযোগিতা হয়। এছাড়াও কৌতুক, একক অভিনয়, উপস্থিত বক্তিতা,রচনা প্রতিযোগিতা,উপস্থিত গল্প বলা ইত্যাদি প্রতিযোগিতা হয়। এসবের বিজয়ী প্রতিযোগীকে বছর শেষের দিকে একটা বিশাল অনুষ্ঠান করে পুরস্কৃত করা হয়। অনুস্থানে এলাকার গণ্যমান্য বাক্তিবর্গ এবং একজন বিশেষ ব্যক্তি প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকেন।

একজন শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে ছাত্ররা নিজ জেলার ভিতরে এবং আন্তঃজেলা টুর্নামেন্টে বিভিন্ন খেলায় অংশগ্রহণ করে। বিশেষ করে ক্রিকেট খেলায় তাদের অবদান অনেক বিস্তৃত। বিভিন্ন সময় জেলা চাম্পিয়ান ও জাতীয়ভাবে অনেক পুরস্কার পায়। একজন স্কাউট শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে ছাত্ররা নিয়িমিত স্কাউট ক্লাস করে। এবং বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে।

তাছাড়া স্কুলে নিয়িমিত বিতর্ক প্রতিযোগিতা,রেডক্রিসেন্ট কার্যক্রম,বিজ্ঞান মেলা,তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সপ্তাহ ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হয়।

ধর্মীয় শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে বার্ষিক ইসলামিক প্রতিযোগিতা হয় এতে সুন্দর আজান দেওয়া প্রতিযোগিতা, কুরআন তেলায়াত প্রতিযোগিতা, হাম-নাত প্রতিযোগিতা, ইসলামিক রচনা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। বিজয়ী ৩জন কে পুরস্কৃত করা হয়। তাছাড়া প্রতি বছর বার্ষিক মিলাদ-মহাফিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রত্যেক অভিবাবকে দাওয়াত করা হয়। মিলাদ শেষে খাওয়া ব্যাবস্থা থাকে।



                                     

7. অর্জন

  • ২০১৩ সালে এস সি পরিক্ষায় রাজশাহী শিক্ষা বোডে ২০ তম স্থান
  • ২০১০ এবং ২০১১ সালে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপণী পরীক্ষায় নওগাঁ জেলায় অত্র বিদ্যালয়টি প্রথম স্থান অধিকার করে।
                                     

8. শতবর্ষপূর্তি

১৯১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া স্কুলটির ২০১৭ সালে ১০০ বছর পূর্তি হয়। শতবর্ষপূর্তি উপলক্ষে স্কুলের প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের নিয়ে স্কুল প্রাঙ্গণে দুইদিন ব্যাপী উৎসব পালন করা হয়।

                                     

9. উল্লেখযোগ্য প্রাক্তন শিক্ষার্থী

  • সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বাংলাভাষার বরেণ্য কবি ও সাহিত্যিকবর্তমানে কলকাতায়
  • মরহুম ডঃ মোজাম্মেল হক, মহাপরিচালক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা।
  • পুলিশ বিভাগের সাবেক আইজিপি আলমগীর কবির।
  • জনাব মোঃ আলতাফ হোসেন, ফুল ব্রাইট স্কলারশীপ প্রাপ্তযুক্তরাষ্ট্র প্রধান শিক্ষক, নওগাঁ কে.ডি. সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও নওগাঁ জিলা স্কুল।
  • অধ্যাপক তৌহিদুর রহমান, ইউনিভার্সিটি আলাবামা হান্টসভিল
                                     

10. পরিচালনা পরিষদ

ম্যানেজিং কমিটির দ্বারা স্কুলটি পরিচালিত। পরিচালনা কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক। সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন প্রধান শিক্ষক, সিভিল সার্জন, নির্বাহী প্রকৌশলী ও জেলা শিক্ষা অফিসার।